মো: আজমির হোসেন
ডীন ও চেয়ারম্যান
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও গবেষক
কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত সংসদীয় আসনগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তন যতবার হয়েছে, ততবারই এই দেবিদ্বার সংসদীয় আসনের রাজনৈতিক সমীকরণও বিভিন্নভাবে বদলেছে। ব্যক্তি ইমেজ, মুন্সি পরিবারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উত্থান পতন, সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর দলীয় সংগঠন এবং স্থানীয় প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদি নানান সমীকরণ মিলিয়ে দেবিদ্বারের রাজনীতি বরাবরই কুমিল্লা তথা সমগ্র বাংলাদেশে ব্যতিক্রম।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে এই আসনের রাজনৈতিক গতিপথকে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় নানান দিকে নিয়ে গেছে। দেবিদ্বার থেকে টানা ৪ বার সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপির দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমে ধানের শীষ প্রতীকে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির বিজয় এবং আধিপত্য ছিল দীর্ঘ প্রায় একযুগের অধিক।
কিন্তু ২০১৪ এর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিএনপি বিহীন। বিএনপির বর্জনের সুযোগে স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ফখরুল ইসলাম মুন্সীর সন্তান রাজি মোহাম্মদ ফখরুল বিজয়ী হন। ২০১৮ তে একাদশ নির্বাচন ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের। যদিও বিএনপি নিজ দলের প্রার্থী না দিয়ে জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এর প্রার্থী আব্দুল মালেক রতন কে মনোনয়ন দিলে আবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে পুনরায় রাজি মোহাম্মদ ফখরুল বিজয়ী হন।
মুল রাজনৈতিক চমক শুরু হয় ২০২৪ এর আবারও এক তরফা বিএনপি বিহীন নির্বাচনে। ২০২৪ এর দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বিএনপি ও তার মিত্রদের নিয়ে গঠিত দেশের বেশিরভাগ প্রধান প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই। এই নির্বাচনে রাজী মোহাম্মদ ফখরুলকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী একজন তরুন ও নতুন আওয়ামী লীগের কুমিল্লা উত্তর জেলার একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ ঈগল প্রতীক নিয়ে পরাজিত করে বিজয়ী হন। আর ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবশ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ বিহীন এবং বিএনপির দলীয় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীবিহীন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। বিএনপি এই আসনে পুনরায় সাবেক এমপি ও প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সিকে মনোনয়ন দেয় কিন্তু কোন বিকল্প প্রার্থী দেয়নি বা দল থেকে আর কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেয় নি। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যাংকে খেলাপি লোন থাকায় আদালত বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। যেহেতু আওয়ামী লীগও এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আর বিএনপির বিকল্প বা বিদ্রোহী কেউ প্রার্থী ছিল না সেহেতু এনসিপির দক্ষিনাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও জুলাই অভ্যুত্থান এর জাতীয় আলোচিত নেতা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট এর প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের অখ্যাত প্রার্থী ট্রাক এর জসিমকে পরাজিত করে একপ্রকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হন।
হাসনাত আব্দুল্লাহর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন।
এনসিপির প্রার্থীর বিজয় এর মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে কুমিল্লা দেবিদ্বারে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী বা বিদ্রোহী প্রার্থীর বাইরে নতুন দল হিসেবে এনসিপির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। যদিও দুই তৃতীয়াংশ আসন বেশি পেয়ে বিএনপি জোট সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জাতীয় ও স্থানীয় ক্ষমতার এই পরিবর্তন এখন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলবে, এমনটাই দেবিদ্বার এর আপামর সাধারণ জনগণের এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব, সাংগঠনিক সুবিধা, প্রশাসনিক যোগাযোগ, কর্মীদের মনোবল এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি সাধারণত বিরোধী জোট ও অন্য দলগুলোর তুলনায় শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সেই বিবেচনায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র উল্টো।
বিএনপির আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল, সাংগঠনিক বিভক্তি, মুন্সি পরিবারের দুই বিএনপির নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির সাথে তার ভাই তারেক মুন্সির প্রকাশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, জাতীয় পার্টি বা অন্যান্য দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ইত্যাদি নানান সমীকরণ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন নাই কিন্তু দেবিদ্বারের রাজনীতি কখনোই কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেনি। এই আসনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ফখরুল ইসলাম মুন্সি, তাঁর ছেলে রাজি মোহাম্মদ ফখরুল, সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ এবং গোলাম মোস্তফার নাম প্রভাব নেতাকর্মীদের অবস্থান এখনও স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে পরিচিত। অন্যদিকে বিএনপির সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ও তাঁর চাচাতো ভাই তারেক মুন্সিকে ঘিরেও স্থানীয় নেতৃত্বের নেতাকর্মীদের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটগঠনের পরেও স্থানীয় সরকার নির্বাচিন ঘিরে এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা সাইফুল ইসলাম শহিদ নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে ভোটের বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু দলীয় জনপ্রিয়তার হবেনা বরং সাংগঠনিক সক্ষমতা, প্রার্থী নির্বাচন, অভ্যন্তরীণ ঐক্য, ভোটারদের নিকট গ্রহনযোগ্যতা, আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং সাধারণ মানুষ এর নিকট আস্থা অর্জনেরও পরীক্ষা হবে ।
দেবিদ্বারের ভোটাররা অতীতেও প্রমাণ করেছেন, শেষ পর্যন্ত তারা স্থানীয় জনমানুষের গ্রহণযোগ্যতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।
দেবিদ্বারের রাজনীতিতে এইমুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজ দলের আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল ও বিভাজন। দলীয় কোন্দল, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যদি তৃনমূলের নেতাকর্মীদের হতাশ করে ও জনস্বার্থকে আড়াল করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বড় দুই দল আর সেই সুবিধার ফল ভোগ করতে পারে নবাগত উদীয়মান দলের প্রার্থীরা।

আর যদি রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারে, তাহলে কুমিল্লার দেবিদ্বার আবারও বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাই শুধু মেম্বার, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, পৌর কাউন্সিলর বা মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনের লড়াই নয়। এটি হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি পরীক্ষা করার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক । যেহেতু হাসনাত আব্দুল্লাহ আলোচিত বিরোধী দলের নেতা সেহেতু দেবিদ্বারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলের উপর সরকারি দল বিএনপির ও নিবন্ধন হারানো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান যাচাই বাছাই ও বিশ্লেষণ করার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।