বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট রাজনীতি নতুন কিছু নয়। তবে কখনো কখনো একটি সিদ্ধান্ত পুরো রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে নাড়িয়ে দেয়। ঠিক তেমনই এক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এলডিপি।
দীর্ঘ সময় বিএনপির সঙ্গে পথচলার পর এলডিপি এবার যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিকাল ৫টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলার আবদুস সালাম হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
ঘোষণার পরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা, প্রশ্ন আর বিশ্লেষণ। অনেকেরই প্রশ্ন—হঠাৎ করে কেন এই সিদ্ধান্ত?
তবে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলছেন, এই সিদ্ধান্ত মোটেও হঠাৎ নয়। এর আগের দিন শনিবার দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে সর্বসম্মতিক্রমেই বিএনপির সঙ্গে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আসন সমঝোতার ব্যর্থতাই মূল কারণ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট পরিবর্তনের মূল কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন সমঝোতায় চরম ব্যর্থতা।
কর্নেল অলি আহমদ জানান, এলডিপি বিএনপির কাছে ১৪ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর একটি শর্টলিস্ট দিয়েছিল। তবে অভিযোগ, তালিকা দেওয়ার পর বিএনপি আর কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেই বসেনি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
“এই তালিকার মানে এই নয় যে ১৪ জনকেই মনোনয়ন দিতে হবে। অন্তত ৮ থেকে ১০ জনকে বিবেচনায় নিলেই আমাদের দল সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকতে পারত।”
কিন্তু সেই ন্যূনতম চাহিদাটুকুও পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ এলডিপির।
বৈঠক না হওয়ার অভিযোগ
এলডিপির আরও অভিযোগ, বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকই হয়নি।
দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিএনপির কার্যালয়ে অপেক্ষা করেও আলোচনার ডাক পাননি এলডিপির নেতারা।
কর্নেল অলি আহমদের ভাষায়,
“আমাদের শর্টলিস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”
অবমূল্যায়নের অভিযোগ
এলডিপির দাবি, বিএনপি যেখানে শত শত আসনে প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে এলডিপিকে কার্যকরভাবে দেওয়া হয়েছে মাত্র একটি আসন।
অলি আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা চান্দাবাজি করি না। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বছরের পর বছর দল চালিয়েছি। অথচ শেষে দেখা গেল ছাগল আর গরুর দাম এক!”
তিনি আরও বলেন, বিএনপির সংকটকালে এলডিপির নেতারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনো যোগাযোগই নেই।
একক নির্বাচন থেকে নাটকীয় মোড়
এলডিপির জোট ছাড়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আরেকটি নাটকীয় অধ্যায়।
কর্নেল অলি আহমদ জানান, প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে দলের তৎকালীন মহাসচিব ড. রিদওয়ান আহমদ এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবে সবাই একমত হয়ে লিখিতভাবে স্বাক্ষর করেন।
কিন্তু পরবর্তীতে সেই ড. রিদওয়ান আহমদই বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চান—যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বার্তা কী?
এলডিপির জামায়াত জোটে যোগ দেওয়া শুধু একটি দলবদল নয়; এটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের স্পষ্ট বার্তা।
এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য যেমন বড় প্রশ্ন তৈরি করছে, তেমনি নতুন জোট রাজনীতির সম্ভাবনাও উন্মোচন করছে।
শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত আগামী নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে—তার উত্তর দেবে সময়ই।