আবাসন খাতে স্বচ্ছতা, সততা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখা এই শর্ত পূরণ করেই নির্মাণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য হতে হয়। এই শর্ত মানা হচ্ছে কিনা, তা তদারকির দায়িত্ব থাকে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের ওপর। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে তখনই, যখন সেই পর্ষদের নেতৃত্বে আসতে চান এমন একজন ব্যক্তি, যার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই রয়েছে একাধিক নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ।
আলোচনায় থাকা এই ব্যক্তি হলেন অ্যামিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর উদ্দিন আহমেদ। তিনি আসন্ন রিহ্যাব নির্বাচনে ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’ প্যানেল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার ব্যালট নম্বর ২২।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুর উদ্দিন আহমেদের মালিকানাধীন অ্যামিটি ডেভেলপার্স চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) শর্ত উপেক্ষা করে নগরীর আবেদিন কলোনিতে একটি ১১ তলা ভবন নির্মাণ করে এবং ফ্ল্যাট বিক্রিও সম্পন্ন করেছে। অথচ ভবনটি অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সিডিএ। এখানেই শেষ নয় নগরীর এমএম আলী রোডে আরেকটি বহুতল ভবন নির্মাণের আবেদন করা হলেও অনুমোদন পাওয়ার আগেই নির্মাণকাজ শুরু করে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন তলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে বলেও সরেজমিনে দেখা গেছে। এছাড়া প্রতারিত গ্রাহকদের একাধিক মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অ্যামিটি ডেভেলপার্স রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান (নিবন্ধন নম্বর ১৫৬২/২০১৯)। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন নুর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী রেহানা আক্তার। আগামী ১৮ এপ্রিল রিহ্যাব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’ প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা দূর করে একটি স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
সিডিএ সূত্র ও সরেজমিনে দেখা যায়, আবেদিন কলোনির লাভ লেনে ‘অ্যামিটি সেলিম এনজেলিক’ নামে ১১ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও সিডিএ শর্তসাপেক্ষে ভবনটির জন্য ৮ তলার অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি সেই অনুমোদন অমান্য করে অতিরিক্ত ৩ তলা নির্মাণ করে। ফলে ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ (সংশোধিত ১৯৮৭) অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওই ভবনের ফ্ল্যাটগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বাসিন্দারা বসবাসও শুরু করেছেন, যা ক্রেতাদের নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জানা গেছে, পরবর্তীতে ৮ তলার অনুমোদন বাতিল চেয়ে ১১ তলার জন্য নতুন করে আবেদন করে অ্যামিটি ডেভেলপার্স। তবে আবেদন করার আগেই ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে করা সেই আবেদন এখনও অনুমোদন পায়নি।
সিডিএ’র অথরাইজেশন অফিসার-২ তানজিব হোসাইন বলেন, আবেদিন কলোনির ভবনটি অনুমোদনবিহীন হওয়ায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি নোটিশে সাড়া দেননি। সব প্রক্রিয়া শেষে ভবনটি উচ্ছেদের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে।
এদিকে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি প্রকল্প ‘অ্যামিটি রওশন’ নগরীর ১২ এমএম আলী সড়কে নির্মাণাধীন। সেখানে ৯ তলা ভবনের অনুমোদনের আবেদন করা হলেও অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন তলার ছাদ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে তানজিব হোসাইন বলেন, এই প্রকল্পটিও অনুমোদনবিহীন এবং এটি বেআইনি কাজ। দেরি হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ করা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(১) ধারা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর ৩ উপবিধির লঙ্ঘন। এছাড়া অনুমোদনের বাইরে ভবন নির্মাণ করলে ১২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী মোবাইল কোর্টেও এ ধরনের অপরাধের বিচার করা যায়। একই সঙ্গে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রকল্প শুরুর আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নুর উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। তিনি উল্টো প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি জনগণের জন্য কাজ করেন, নাকি সরকারের পক্ষে?’ পরে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে, নিজের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও নির্বাচনে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন নুর উদ্দিন আহমেদ। অথচ তার প্রকল্পে বিনিয়োগ করে ঝুঁকিতে পড়েছেন অনেক গ্রাহক, যাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে আইনি আশ্রয়ও নিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে, নিয়ম অমান্য করার অভিযোগ থাকা একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে স্বচ্ছ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।