বাইপাস সার্জারির পরও শরীর পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। তবু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাননি। বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আসরের নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে বেরিয়ে সহকারীকে কিছু নির্দেশ দিলেন। গাড়ি থেকে আনা হলো একটি প্যাকেট। কিছুক্ষণ পর দৃশ্য বদলে গেল একদল শিশু তাকে ঘিরে ধরেছে। তিনি স্নেহভরে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন চকলেট। এর মধ্যেই এক শিশু বাড়তি চকলেট চাইল, বোনের জন্য নিয়ে যাবে বলে।
এই দৃশ্যের কেন্দ্রীয় মানুষটি ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির, যিনি দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত আচরণ দিয়েও আলোচনায় থাকেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “গ্রেট” শব্দের মতোই ইতিহাসও কখনও কখনও অতিব্যবহারে ম্লান হয়ে যায়। তবে কিছু ব্যক্তি নিজেদের কর্মকাণ্ড দিয়ে ইতিহাসে আলাদা স্থান তৈরি করেন। জামায়াতের রাজনীতিতে ডা. শফিকুর রহমানকে অনেকেই সেই প্রেক্ষাপটে দেখেন সমর্থকরা বলেন, তিনি দলীয় রাজনীতিকে ঘরোয়া পরিসর থেকে মানুষের দরজায় পৌঁছে দিয়েছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বর্তমানে দলটির শীর্ষ নেতা হিসেবে টানা একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সাম্প্রতিক সময়েও তিনি আবারও আমির নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি ২০১৯ সাল থেকে দলটির নেতৃত্বে আছেন এবং চিকিৎসক পেশা থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৫৮ সালে জন্ম নেওয়া ডা. শফিকুর রহমান ছাত্রজীবনে জাসদের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতির মূল ধারায় উঠে আসেন।সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছেন এবং সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়।
জামায়াতের জন্য কঠিন সময়ের মধ্যেই তিনি শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন যখন দলটির অনেক শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধ মামলায় কারাগারে ছিলেন এবং একাধিক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ঐ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলকে সংগঠিত রাখার চ্যালেঞ্জ ছিল বড়।
নেতৃত্বে এসে তিনি তুলনামূলক ভিন্ন ধাঁচের রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ বা মানবিক সংকটে মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি যা সমর্থকদের মতে দলটির ভাবমূর্তি বদলাতে ভূমিকা রেখেছে।
রাজনৈতিক মহলে তার রাজনীতির তিনটি মূল দিক নিয়ে আলোচনা হয় :
সহিংস রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে ফল দেয় না এমন অবস্থান
অন্য দলের ছায়ায় থেকে সংগঠন বড় করা সম্ভব নয় এমন ধারণা
ইসলামের মানবিকতা ও ন্যায়বিচারকে রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রাখা
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের রাজনীতিতে কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকেও প্রার্থী দেওয়ার ঘটনা নজরে এসেছে বলে দলীয় সূত্র দাবি করে।
তবে দল ও নেতার কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারীর নেতৃত্ব বিষয়ে তার মন্তব্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ধরনের মন্তব্য জাতীয় পর্যায়েও বিতর্কের কেন্দ্র হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উল্লেখ এসেছে।
বর্তমান সময়ে ডা. শফিকুর রহমানকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে এক ধরনের জনআগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার উপস্থিতিতে মানুষের ভিড় এবং শিশু-কিশোরদের আগ্রহের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে দলটি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।
রাজনীতিতে অনেক সময় ব্যক্তি ও পরিস্থিতি মিলে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার নেতৃত্ব ও দল কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে সেটাই এখন সময়ের অপেক্ষা।