বদলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ
(মো: আজমির হোসেন, ডীন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)কুমিল্লা ৪ দেবিদ্বারের রাজনীতির আকাশে এখন চলছে ঝড়ের আগের সুনশান নীরবতা। এই আসনের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগ বিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ বিজয়ী হয়ে তাদের জোটের সমর্থকদের নিকট দেশজুড়ে আলোচিত এবং বিরোধী পক্ষের নিকট সমালোচিত।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাসনাতের এমপি হিসেবে বিজয়ী হবার পর থেকে দেবিদ্বার এর ভোটের মাঠে এইমুহূর্তে খুব বেশি আলোচনা বা জোরালো শব্দ নেই, কিন্তু প্রতিটি দলের ভেতরে ভেতরে কঠিন প্রতিযোগিতার গোপন হিসাব নিকাশ চলছে। দলের ভিতরে কে কার সঙ্গে, কে কার বিপক্ষে, কে সামনে আসছেন আর কে আড়ালে থেকে পরের রাজনৈতিক গুটির কঠিন চালটি দিচ্ছেন, তা নিয়ে কুমিল্লার রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা ।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতার চেয়ে এখন দেবিদ্বারে নিজের দলের ও নিজের ঘরের নেতাকর্মীদের মধ্যে লি হিসাব নিকাশ যেন বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। একসময় দেবিদ্বার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার এলাকা হিসেবে পুরো কুমিল্লায় পরিচিত ছিল। কিন্তু সেই পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ছবি এখন আর দেবিদ্বারে নেই। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল, এনসিপি যেহেতু সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে তাই তারা নতুন শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে, জামায়াতও তুলনামূলক ভোটের মাঠে সক্রিয়।
আর বিএনপি যেহেতু দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে এবং আওয়ামী লীগ বিহীন এখন দেশের সবচেয়ে বড় দল হয়েও অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ও কোন্দল নিয়ে আছে চরম অস্বস্তিতে। সাবেক বিএনপির ৪ বারের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি দেবিদ্বারের রাজনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞতা ও তার নেতাকর্মীদের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, পুরোনো পরিচয় সব সময় নতুন ভোটের বা জনসমর্থন এর কোন নিশ্চয়তা দেয় না। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন প্রজন্মের ভোটার, নতুন নেতৃত্ব এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো রাজনৈতিক হিসাবকে মুহূর্তেই পাল্টে দিতে পারে।
দেবিদ্বারে বিএনপির আগের বাতিল কমিটির সদস্য সচিব তারেক মুন্সি, সাইদুর রহমান লিটন সরকার, আব্দুল আউয়াল ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন নেতাকে ঘিরে আলাদা বলয়ের যে আলোচনা বা সমালোচনা রয়েছে, তা যদিও তৃণমূলের ভিতর গভীরভাবে জরিয়ে আছে, তাহলে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য সেটি বড় সতর্ক সংকেত। কারণ তৃণমুলের কর্মীরা যখন দলের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে নেতার পরিচয়ে বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সংগঠনের শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির পুরোনো আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। নতুন কমিটিতে অবশ্য আবারও দেবিদ্বারের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির ছেলে ব্যারিস্টার রিজভী উল আহসান মুন্সি ও উত্তর জেলা মহিলা দলের সুফিয়া খাতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। জেলার পরে উপজেলা ও পৌর পর্যায়েও নতুন আহবায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে এবং সকল পর্যায়ে মুল কমিটি গঠনের কাজ চলছে। একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যকে ইতিমধ্যেই দেবিদ্বারের এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ এর বিপক্ষে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়াও স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় প্রশ্ন হলো, নতুন কমিটি কি পুরোনো বিরোধ মুছে দেবে, নাকি পুরোনো বিরোধই নতুন কমিটির ভেতরে আবার নতুন রূপ নেবে? রাজনীতিতে যেকোনো দলের কমিটি হলো কাঠামো, কিন্তু কর্মীরাই হলো দলের নিবেদিত প্রাণ। শুধু কাগজের কমিটিতে নাম লিখে কোন সংগঠন কখনো শক্তিশালী হয় না। তৃণমূলের কর্মীরা যদি মনে করেন তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তাদেরকে মুল্যায়ন করা হচ্ছে না, তাহলে বড় বড় পদও রাজনীতির মাঠে খুব বেশি কাজে আসে না।
অন্যদিকে এই আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থা সরকার পতনের পর থেকে নিঃসন্দেহে কঠিন ও শোচনীয় । সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, এমপি আবুল কালাম আজাদ এবং রোশন আলী মাস্টারদের ঘিরে একসময় যে সাংগঠনিক শক্তি ছিল, বর্তমান মাঠের বাস্তবতায় তার বড় অংশই দৃশ্যমান নয়। শীর্ষ হেভিওয়েট নেতারা এবং অনেক নেতাকর্মী আছে পলাতক, আত্মগোপনে অথবা নিষ্ক্রিয়। ফলে দেবিদ্বারে আওয়ামী লীগের আগের সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে । কিন্তু বিএনপির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলের সুযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ হিসেবে আপাতত দুর্বল মানেই বিএনপির জয় নিশ্চিত নয়। এর ফলাফল ত এনসিপির সংসদ সদস্য হিসেবে হাসনাত আব্দুল্লাহর বিজয় দেখেই বুঝা যায়। রাজনীতির মাঠ কখনো খালি পড়ে থাকে না। একটি দল সরে গেলে অন্য দল সেই জায়গা দখল করে নেয়।
দেবিদ্বারে এখন সেই নতুন রাজনৈতিক শক্তির নাম এনসিপি। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা এবং সদস্য সংগ্রহ নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। হাসনাত আব্দুল্লাহর উত্থান পুরো কুমিল্লায় এবং দেবিদ্বারের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের আগমনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গান-বাজনা নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে ইসলামি দলগুলোর বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি এখন দেবিদ্বারের রাজনীতির প্রধান আলোচিত চরিত্র।
জামায়াতও মাঠে রয়েছে। এনসিপি ও জামায়াতের জোট বিদ্যমান। তবে এনসিপির উত্থানের পর তাদের পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান দেবিদ্বারে কতটা শক্ত থাকবে, সেটিও সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে। এইসময় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে চলছে চতুরমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এর মধ্যে সামনে আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভায় বিএনপির একাধিক প্রার্থী হলে তাদের দলীয় ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের যেহেতু দল হিসেবে নিবন্ধন নাই সেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে এনসিপি ও জামায়াতের প্রার্থী যুক্ত হলে ভোটের হিসাব আরও জটিল হবে। তখন হয়তো দেবিদ্বারের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্যের পর্দা উঠবে।
দল হিসেবে কার কত জনপ্রিয়তা, কার সঙ্গে কত কর্মী, কার পেছনে কত ভোট, আর কার প্রভাব শুধু সভা-মিছিলের ভিড়েই সীমাবদ্ধ, সবকিছুর হিসাব হবে আগামীর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে। আজ বিএনপির বা এনসিপির যারা মনে করছেন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয় তাদের হাতের মুঠোয়, আগামীতে তাদেরই হয়তো নতুন করে হিসাব করতে হবে। আর যারা নীরবে ভোটের মাঠ গোছাচ্ছেন, তারাই হয়তো শেষ মুহূর্তে চমক দেখাবেন।
দেবিদ্বারের রাজনীতিতে তাই প্রশ্ন এখন শুধু কে জিতবে তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, শেষ চালটি কে দিতে পারবে ? ব্যালট বাক্স খোলার আগ পর্যন্ত সেই উত্তর হয়তো কারও জানা নেই। তবে একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত: দেবিদ্বারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় লড়াই শুধু দলগুলোর মধ্যে হবে না, লড়াই হবে প্রতিটি দলের নিজের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের মোকাবিলা করার ভেতরেও। আর সেই লড়াইয়ে যে দল নিজের ঘর সামলাতে পারবে, আভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুন্দর মীমাংসা করে দল সাজাতে পারবে শেষ হাসিটা হয়তো তারই হবে।
কুমিল্লা ৪ দেবিদ্বারে এখন সব দলের সক্রিয় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবং নিরপেক্ষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যে দলের প্রার্থীরা ইউনিয়ন, উপজেলা বা পৌর নির্বাচনে বেশি সংখ্যায় বিজয়ী হয়ে দল ও সংগঠন গোছাতে পারবে সেই দল ভবিষ্যতে দেবিদ্বারে দলীয়ভাবে শীর্ষভাবে নিয়ন্ত্রকের থাকবে।
সম্পাদকীয় কার্যালয়:
১৬৬/৫, মাটিকাটা, ভাষানটেক, ঢাকা-১২১১।
ইমেইল : zerotv0566@gmail.com।
Copyright © 2026 Zero TV. All rights reserved.